📣 এই জায়গায় আপনার বিজ্ঞাপন দিন — মূল্য তালিকা দেখুন
স্পনসর্ড

জুমআর দিন (শুক্রবার)-এর ফজীলত

কলমদানি · Kolomdani Desk · ডিসেম্বর 5, 2025

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন : يايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَرا إلى ذكْرِ اللهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ . অর্থ : হে মুমিনগণ, যখন জুমার নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে (নামাজের জন্য) দ্রুত যাও এবং বেচাকেনা ত্যাগ করো। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
হে মুমিন মুসলিমগণ! তোমরা যারা তাওহীদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছ এবং আল্লাহ্‌ তাআলাকে এক ও অদ্বিতীয় বলে মানো—তোমাদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, জুমআর দিন যখন তোমাদেরকে জুমআর নামাজ আদায়ের জন্য আহ্বান করা হবে, তখন তোমরা তোমাদের সকল ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য কাজকর্ম বন্ধ করে নামাজ আদায়ের জন্য দ্রুত উপস্থিত হবে। যদি তোমরা প্রকৃত জ্ঞানী হও, তবে জেনে রাখো—তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুনিয়াবি কাজের তুলনায় নামাজ অনেক উত্তম ও শ্রেষ্ঠ।

এই আয়াতের ‘শানে নুযূল’ বা অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হলো, সে সময় ইহুদিরা মুসলমানদের প্রতি তিনটি বিষয়ে গর্ব প্রকাশ করত:

(ক) তারা বলত, “আমরা আল্লাহ্‌র অধিক প্রিয়; তোমরা নও।”
(খ) “আমাদের কাছে আসমানী কিতাব রয়েছে; তোমাদের কোনো কিতাব নেই।”
(গ) “রবিবারকে আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য সাপ্তাহিক মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন; কিন্তু তোমাদের জন্য এমন কোনো দিন নির্ধারণ করা হয়নি।”

ইহুদিদের এই অহংকার দূর করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্‌ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন।

জুমআর ফজীলত সম্পর্কিত হাদীসসমূহ

আলা ইবনে আবদুর রহমান তাঁর পিতার মাধ্যমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন:
রাসূলুল্লাহ (দ.) ইরশাদ করেছেন—
“শুক্রবার যে সৌন্দর্য ও মহিমা নিয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয়, অন্য কোনো দিনে তা হয় না। মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সমস্ত সৃষ্টিই শুক্রবারকে ভয়ে থাকে। প্রতিটি মসজিদের প্রতিটি দরজায় দু’জন ফেরেশতা অবস্থান করেন। তাঁরা আগত মুসল্লিদের আমল লিপিবদ্ধ করেন।
সর্বপ্রথম আগত ব্যক্তির জন্য উট কোরবানির সমান সওয়াব; দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য গরু কোরবানি করার সমান সওয়াব; তৃতীয় ব্যক্তির জন্য ছাগল কোরবানির সমান সওয়াব; চতুর্থ ব্যক্তির জন্য মুরগি কোরবানির সমান সওয়াব এবং পঞ্চম ব্যক্তির জন্য ডিম প্রদানের সমান সওয়াব লেখা হয়।
ইমাম যখন খুতবা আরম্ভ করেন, তখন ফেরেশতারা তাঁদের দফতর বন্ধ করে দেন।”

আবু সালমা হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (দ.) বলেন:
“সমস্ত দিনের মধ্যে শুক্রবার সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ। এই দিনেই আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন, এই দিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন এবং এই দিনই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করেছেন। কিয়ামতও শুক্রবার সংঘটিত হবে।
এদিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, যখন কোন মু’মিন বান্দা আল্লাহর কাছে যা প্রার্থনা করবে, তা অবশ্যই কবুল হবে—অবশ্য হারাম কিছু চাইলে তা গ্রহণ করা হবে না।”
আবু সালমা ও আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম বলেন, এই সময়টি শুক্রবারের শেষ প্রহর। এ সময়েই হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে মানযার বর্ণনা করেন, রাসূল (দ.) বলেছেন:
“শুক্রবার সকল দিনের নেতা এবং আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ—এমনকি ঈদের দিনের চেয়ে বেশি।”

আল্লাহ শুক্রবারকে পাঁচটি বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন:

১. এই দিনে হযরত আদম (আ.) সৃষ্টি হয়েছেন।
২. এই দিনে তাঁকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে।
৩. এই দিনেই তাঁর ওফাত হয়েছে।
৪. এই দিনে এমন একটি গ্রহণযোগ্য মুহূর্ত আছে, যখন আল্লাহ মুমিন বান্দার দোয়া কবুল করেন।
৫. শুক্রবারেই পৃথিবী ধ্বংস হবে।

আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ শুক্রবার আল্লাহকে প্রচণ্ডভাবে ভয় করেন। আকাশ-জমিন পর্যন্ত আল্লাহর ভয়ে কাঁপে।

আবু নসর তাঁর পিতার মাধ্যমে বর্ণনা করেন, হযরত আলী (রা.) বলেন:
“শুক্রবার শয়তান ও তার সৈন্যরা পতাকা হাতে নিয়ে লোকদের ধোঁকা দিতে বাজার-রাস্তা ঘুরে বেড়ায়। আর ফেরেশতারা মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে নামাযে আগতদের সওয়াব লিপিবদ্ধ করেন।
ইমাম খুতবা শুরু করলে সবাই তা মনোযোগ দিয়ে শুনে। যে ব্যক্তি ইমামের কাছে বসে মনোযোগসহ খুতবা শোনে, সে দ্বিগুণ সওয়াব পায়; দূরে বসে মনোযোগ দিলে এক গুণ সওয়াব।
কিন্তু যে ব্যক্তি ইমামের সামনে বসে অযথা কথা বলে, সে দ্বিগুণ গোনাহগার হয়; দূরে বসে এসব করলে এক গুণ গোনাহ হয়। আর যে কেউ অন্যকে বলে, ‘চুপ থাক’, সেও কথাবার্তা বলার শামিল হয় এবং জুমার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়।”
হযরত আলী (রা.) বলেন, “আমি এই কথাগুলো রাসূল (দ.)-কে বলতে শুনেছি।”

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) আরও বলেন—রাসূল (দ.) বলেছেন:
“জুমার খুতবার সময় কেউ তার পাশের ব্যক্তিকে ‘চুপ থাক’ বললেও তা অনর্থক কথার অন্তর্ভুক্ত হবে।”

আমর ইবনে শো’আয়েব তাঁর পিতা ও দাদা থেকে বর্ণনা করেন:
“শুক্রবার ফেরেশতারা মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে মানুষের নাম লিখে। ইমাম এলে তাঁরা দফতর বন্ধ করে দেন।
ফেরেশতারা প্রশ্ন করেন—অমুক আজ কেন এলো না? সে কি অসুস্থ? তারপর আল্লাহর কাছে দোয়া করেন—যদি অসুস্থ হয় তাকে আরোগ্য দাও, আর পথভ্রষ্ট হলে তাকে সরল পথে ফিরিয়ে দাও।”

হযরত সাবিত (রা.) থেকে বর্ণিত:
“ফেরেশতাদের কাছে সোনার কলম ও রূপার পাতা থাকে। জুমার দিন ও রাতে যে ব্যক্তি জামাতে নামায পড়ে, ফেরেশতারা তাঁর নাম সোনার অক্ষরে লিপিবদ্ধ করেন।”

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত:
রাসূল (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তার ওপর জুমার নামাজ ফরজ। তবে অসুস্থ, মুসাফির, নারী, নাবালেগ ও দাসের ওপর ফরজ নয়।
যে ব্যক্তি খেল-তামাশা বা ব্যবসার কারণে জুমার নামাজ ত্যাগ করে, তার প্রতি আল্লাহ উদাসীন থাকেন। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসনীয়।”

আবুল জাআদ জামীরী বলেন, রাসূল (দ.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আলস্য বা অবহেলার কারণে জুমার নামাজ ছাড়ে, আল্লাহ তার হৃদয়ে সীল মেরে দেন।”

হযরত জাবের (রা.) বলেন—রাসূল (দ.) খুতবায় দাঁড়িয়ে বললেন:
“হে মানুষ! মৃত্যুর আগে আল্লাহর দিকে ফিরে এসো। অধিক যিকির করো, নেককার হও। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বেশি দান করো।
জেনে রাখো, জুমা নামাজ তোমাদের ওপর ফরজ—ইমাম ভালো হোক বা মন্দ।
যে ব্যক্তি জুমা পরিত্যাগ করে, তার কাজে বরকত থাকে না। তার নামাজ, অজু, হজ্জ, যাকাত কবুল হয় না, যতক্ষণ না সে তাওবা করে।”

তিনি আরও বলেন:
“কোন নারী যেন পুরুষের ইমাম না হয়, কোনো বেদুঈন ও ফাসেক ঈমানদারেরও ইমাম হওয়া উচিত নয়। তবে অত্যাচারী শাসক ইমাম হতে পারে।”

হযরত আবু মুসা আশ’আরি (রা.) বলেন:
রাসূল (দ.) বলেছেন—
“কিয়ামতের দিন আল্লাহ সব দিনকে তাদের রূপে দাঁড় করাবেন; কিন্তু শুক্রবার অত্যন্ত উজ্জ্বল ও মনোরম রূপে উঠানো হবে। তার দেহ থেকে মিশকের সুঘ্রাণ ছড়াবে।
মানুষ ও জ্বিন বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবে। শুক্রবার জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবে।
যে সকল মুয়াজ্জিন নিছক আল্লাহর সওয়াবের আশায় আযান দিত, তারা শুক্রবারের সঙ্গী হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”

সাবিত বানানী, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন:
রাসূল (দ.) বলেছেন—
“প্রতিদিন আল্লাহ ছয়জনকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন; আর শুক্রবারের প্রত্যেক ঘন্টায় ছয় লক্ষ পাপীকে মুক্তি দেন।”

আবদুর রহমান ইবনে আবু লায়লা বলেন, আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত—
“যে ব্যক্তি জামাতের সাথে জুমার নামাজ পড়ে, সে একটি মকবুল হজ্জের সওয়াব লাভ করে।
একই মসজিদে জামাতে আসরের নামাজ পড়লে এক ওমরার সওয়াব এবং মাগরিবও যদি জামাতে পড়ে, তবে তার প্রতিটি দোয়া কবুল হয়।”

আবু ইমামাহ বাহেলী বলেন, রাসূল (দ.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি শুক্রবার রোজা রাখে, জামাতে নামাজ পড়ে, জানাযায় অংশ নেয়, দান-সদকা করে, রোগী দেখতে যায় এবং বিয়ের মজলিসে অংশগ্রহণ করে—সে অবশ্যই জান্নাতি হবে।”

শেষ হাদীসে এসেছে—
মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সব জীব শুক্রবারকে ভয় করে, কারণ মনে করে এদিনই কিয়ামত হবে।
শুক্রবার ছাড়া অন্যদিনগুলোতে জাহান্নাম উত্তপ্ত করা হয়। এ জন্যই অন্যদিন দুপুরের নামাজে কিছু বিলম্ব করা হয়; তবে শুক্রবার যেকোনো সময় নামাজ আদায় করা যায়।

মূল সূত্র: কলমদানি — মূল পোস্ট দেখুন