কিশোর মনের জিজ্ঞাসা
۞ ۞ ۞
ইসলামের শাশ্বত ইতিহাস
কিশোর মনের জিজ্ঞাসা
❀ ❀ ❀
মোহাম্মদ শওকত আকবার
۞ ۞۞
ইসলামের শাশ্বত ইতিহাস
কিশোর মনের জিজ্ঞাসা
❀ ❀ ❀
মোহাম্মদ শওকত আকবার
প্রকাশক
শওকতবিডি বইঘর
✦ লেখক পরিচিতি ✦
মোহাম্মদ শওকত আকবার একজন লেখক, সফটঅয়্যার ডেভেলপার এবং প্রযুক্তিপ্রেমী মানুষ, যিনি ইসলামী জ্ঞান ও বাংলা সাহিত্যের প্রচারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি “শওকতবিডি” (showkatbd.com) নামক প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা, যেখানে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সাহিত্যিক কনটেন্ট তৈরি করা হয়। কিশোর-কিশোরীদের মাঝে ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি এই গ্রন্থটি রচনা করেছেন।
🖋️
✦ প্রকাশক পরিচিতি ✦
শওকতবিডি বইঘর একটি অনলাইন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, যা বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য মানসম্মত ইসলামী, সাহিত্যিক ও শিক্ষামূলক বই প্রকাশের মাধ্যমে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যার লক্ষ্য তরুণ প্রজন্মের হাতে সহজ, সুন্দর ও তথ্যবহুল বই পৌঁছে দেওয়া, যা তাদের ঈমান ও মূল্যবোধ গঠনে সহায়ক হবে।
প্রকাশক: সানজিদ শওকত
লেখক: মোহাম্মদ শওকত আকবার
ওয়েবসাইট: showkatbd.com/boighor
প্রথম প্রকাশ: জুন, ২০২৬ ইং
সর্বস্বত্ব: লেখকের দিনলিপি ও সমীক্ষণ প্ল্যাটফর্ম দ্বারা সংরক্ষিত। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই বইয়ের কোনো অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ কোনো যান্ত্রিক বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে পুনরুৎপাদন করা যাবে না।
📚
✦ উৎসর্গ ✦
সাফোয়ান শওকত সাদাফ ও সায়ান শওকতকে
🌙🌟
✺2026 সূচিপত্র ✺
- ভূমিকা
- প্রথম অধ্যায়: মহানবী (সা.)-এর নবুয়ত ও আসমানী ওহীর সূচনা
- দ্বিতীয় অধ্যায়: পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ ও সংরক্ষণের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস
- তৃতীয় অধ্যায়: পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (নামাজ) ও নফল সালাতের ইতিহাস
- চতুর্থ অধ্যায়: সিয়াম (রোজা), শবে মেরাজ ও শবে বরাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
- পঞ্চম অধ্যায়: দুই ঈদ ও ইসলামের সামাজিক উৎসবের সূচনা
- ষষ্ঠ অধ্যায়: কাবা ঘর নির্মাণ ও পবিত্র হজের ইতিহাস
- সপ্তম অধ্যায়: ইসলামী পোশাকের ঐতিহ্য: টুপি ও পাগড়ির ইতিহাস
- অষ্টম অধ্যায়: খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা ও এর ঐতিহাসিক ক্রমান্বয়
- নবম অধ্যায়: জানাজা, সুন্নতে খত্না ও শরিয়া সম্মত বিয়ের ইতিহাস
- দশম অধ্যায়: ইসলামী সম্ভাষণ 'সালাম' এর অলৌকিক ইতিহাস
- এগারতম অধ্যায়: আজানের অলৌকি ইতিহাস ও তাৎপর্য
- উপসংহার
۞ ۞
প্রিয় কিশোর ও তরুণ বন্ধুরা, আমরা মুসলিম হিসেবে প্রতিদিন নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, ঈদ উদযাপন করি। কিন্তু আমরা কি জানি—এসব সুন্দর ইবাদত ও ঐতিহ্যের পেছনের গল্পটা ঠিক কেমন ছিল? ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনে রয়েছে একটি চমৎকার এবং শিক্ষণীয় ইতিহাস। এই বইটি তোমাদের সেই সোনালী অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, যা তোমাদের ঈমানকে আরও মজবুত করবে এবং দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দেবে।
🌙✨
❀ ❀
আরবের অন্ধকার যুগে, যখন মানুষ মূর্তি পূজা, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও নানা অন্যায়ে লিপ্ত ছিল, তখন মক্কার কুরাইশ বংশে জন্ম নেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অনন্য চরিত্রের অধিকারী, যার কারণে সবাই তাকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত বলে ডাকত।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমাজের এই পতন তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। তিনি মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত ‘হেরা গুহায়’ গিয়ে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এভাবে দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার পর, তাঁর বয়স যখন ৪০ বছর, তখন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে। হিজরী পূর্ব ১৩ সনের রমজান মাসের এক রাতে (লাইলাতুল কদর) আল্লাহর নির্দেশে প্রধান ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আ.) হেরা গুহায় আগমন করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন—“ইকরা” (পড়ুন)। রাসূল (সা.) বললেন, “আমি তো পড়তে জানি না।” জিবরাইল (আ.) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনবার চাপ দিলেন এবং সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত পাঠ করে শোনালেন। এর মাধ্যমেই শুরু হলো মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তের মহান অধ্যায়।
🕊️🌟
✿ ✿
হেরা গুহায় ওহী নাযিলের মাধ্যমে যে পবিত্র মহাগ্রন্থের সূচনা হয়েছিল, তা দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে মানবজাতির প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়। কোরআন একবারে কিতাব আকারে নাজিল হয়নি, বরং সমসাময়িক ঘটনার সমাধান ও দিকনির্দেশনা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে রাসূল (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হতো।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আজকের মতো কাগজ বা ছাপাখানা ছিল না। তাই কোরআন সংরক্ষণের মূল মাধ্যম ছিল সাহাবিদের ‘হিফজ’ বা মুখস্থ শক্তি। আরবরা স্মৃতিশক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এছাড়াও নবীজী (সা.)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘কাতিবে ওহী’ বা ওহী লেখক সাহাবিগণ (যেমন: হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত, হযরত মুআবিয়া প্রমুখ) কোরআনের আয়াতগুলো গাছের পাতা, পশুর চামড়া, চওড়া হাড় এবং পাথরের ফলকে লিখে রাখতেন।
রাসূল (সা.)-এর ওফাতের পর হযরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকালে ‘ইয়ামামার যুদ্ধে’ বহু হাফেজে কোরআন শাহাদাত বরণ করেন। এতে হযরত ওমর (রা.) চিন্তিত হয়ে আবু বকর (রা.)-কে কোরআন একত্রিত করার পরামর্শ দেন। হযরত আবু বকর (রা.)-এর নির্দেশে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) সমস্ত লিখিত টুকরো ও হাফেজদের স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ কাগজের পাণ্ডুলিপি (সহীফা) তৈরি করেন। পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে মুসলিম সাম্রাজ্য বহুদূর বিস্তৃত হলে উচ্চারণের ভিন্নতা দূর করার জন্য সেই মূল কপি থেকে সাতটি অনুলিপি তৈরি করে প্রধান প্রধান প্রদেশে পাঠানো হয়। এই অনন্য অবদানের জন্য হযরত উসমান (রা.)-কে ‘জামেউল কোরআন’ বা কোরআন একত্রিতকারী বলা হয়।
📖💚
☘ ☘
নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। নবুয়তের প্রথম থেকেই নামাজ চালু থাকলেও তা পাঁচ ওয়াক্ত এবং সুনির্দিষ্ট ছিল না। নবুয়তের একাদশ বা দ্বাদশ বর্ষে প্রিয় নবী (সা.) যখন সশরীরে অলৌকিক ‘মেরাজ’ ভ্রমণে যান, তখন আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য উপহার হিসেবে দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। পরবর্তীতে হযরত মুসা (আ.)-এর পরামর্শে রাসূল (সা.) আল্লাহর কাছে বারবার আবেদন করলে আল্লাহ তাআলা দয়াপূর্বক তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্তে এনে নির্ধারণ করেন। তবে আল্লাহ ওয়াদা করেন—যে ব্যক্তি এই ৫ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকঠাক আদায় করবে, সে ৫০ ওয়াক্তেরই সওয়াব পাবে। মদিনায় হিজরতের পর এই নামাজের রাকাত ও সুনির্দিষ্ট সময় স্থায়ী রূপ লাভ করে।
‘নফল’ শব্দের অর্থ অতিরিক্ত। ফরজের বাইরে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নফল নামাজের বিধান রাখা হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে, শেষ রাতের ‘তাহাজ্জুদ’ নামাজ মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। পরবর্তীতে সূরা মুয্যাম্মিলের শেষাংশ নাজিল হওয়ার পর তাহাজ্জুদ নামাজ উম্মতের জন্য নফল (ঐচ্ছিক) করা হয়, তবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য এটি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল ছিল।
🕌🤲
✺ ✺
ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অনন্য ইবাদত হলো রোজা। রোজা কেবল আমাদের উপরই ফরজ করা হয়নি, আমাদের পূর্ববর্তী নবী ও উম্মতদের ওপরও রোজা ফরজ ছিল। তবে মুসলমানদের জন্য রমজান মাসের রোজা ফরজ হয় দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে। এর আগে মুসলমানরা প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ‘আইয়ামে বিয’-এর রোজা এবং ১০ই মহররমের ‘আশুরার রোজা’ পালন করতেন। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর পূর্বের রোজাগুলো নফলে পরিণত হয়।
- শবে মেরাজ (লাইলাতুল মেরাজ): নবুয়তের দশম বা একাদশ বছরে, যখন রাসূল (সা.) তাঁর প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবকে হারিয়ে প্রচণ্ড দুঃখী ছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা ও সম্মানিত করতে এই অলৌকিক ভ্রমণ করান। এক রাতে জিবরাইল (আ.)-এর সাথে বোরাক চড়ে তিনি মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস (ইসরা) এবং সেখান থেকে সপ্তআকাশ পেরিয়ে আল্লাহর আরশে আজীমে (মেরাজ) পৌঁছান।
- শবে বরাত (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান): শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে শবে বরাত বা মুক্তির রাত বলা হয়। ঐতিহাসিক ও হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহ প্রথম আকাশে অবতরণ করে বান্দাদের ক্ষমা ও রিজিকের ঘোষণা দেন। এছাড়া এই শাবান মাসেই মুসলমানদের কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মক্কার কাবার দিকে পরিবর্তিত হয়েছিল।
🌙🌟
❉ ❉
মদিনায় হিজরতের আগে মুসলমানদের নিজস্ব কোনো জাতীয় বা সামাজিক উৎসবের দিন ছিল না। হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) লক্ষ্য করলেন—মদিনার মানুষ ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ নামে দুটি প্রাচীন পারসিক উৎসব পালন করছে, যেখানে নাচ-গান, মাদক ও নানা ধরনের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড হতো।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের ডেকে বললেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের এই দুটি দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম ও পবিত্র দুটি উৎসবের দিন দান করেছেন; তা হলো ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা।”
- ঈদুল ফিতর: দীর্ঘ এক মাস রমজানের সিয়াম সাধনা শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া ও আনন্দ প্রকাশের জন্য এই ঈদ। এর মূল উদ্দেশ্য ফিতরা প্রদানের মাধ্যমে গরিবদের আনন্দের অংশীদার করা।
- ঈদুল আজহা: জিলহজ মাসের ১০ তারিখে হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতি স্মরণে পশু কুরবানির মাধ্যমে এই ঈদ উদযাপিত হয়। ২য় হিজরীতে মুসলমানরা প্রথম এই দুই ঈদ উদযাপন শুরু করেন।
🎉🌸
✾ ✾
পবিত্র কাবা শরীফ হলো পৃথিবীর প্রথম ঘর, যা মানবজাতির ইবাদতের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, সর্বপ্রথম ফেরেশতাগণ অথবা আদি পিতা হযরত আদম (আ.) আল্লাহর আদেশে কাবার ভিত্তি স্থাপন করেন। নূহের প্লাবনের সময় এই ঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিলুপ্ত হয়ে যায়। বহু বছর পর, আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর তরুণ পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) মক্কার মরুভূমিতে কাবার সেই প্রাচীন দেয়াল পুনরায় নির্মাণ করেন। নির্মাণ শেষে পিতা-পুত্র দোয়া করেছিলেন, যা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।
কাবা নির্মাণ সম্পন্ন হলে আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দেন পৃথিবীর মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দেওয়ার জন্য। ইব্রাহিম (আ.) পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ডাক দিলে আল্লাহর কুদরতে সেই আওয়াজ কেয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত মানুষের কানে পৌঁছে যায়। এরপর থেকেই হজ চালু হয়। তবে কালের পরিক্রমায় আরবরা কাবার ভেতরে মূর্তি রেখে হজের নিয়ম বিকৃত করে ফেলে। পরবর্তীতে ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) কাবাকে মূর্তিমুক্ত করেন এবং ১০ম হিজরীতে তিনি নিজে ‘বিদায় হজ’ আদায়ের মাধ্যমে হজের সঠিক ও শরিয়তসম্মত নিয়ম পুনরুত্থিত করেন।
🕋✨
۩ ۩
পোশাকের ক্ষেত্রে ইসলাম শালীনতা ও মার্জিত রূপকে পছন্দ করে। আরবের সংস্কৃতি এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে টুপি ও পাগড়ি (আমামা) মুসলিম সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
- টুপি ও পাগড়ি: আরবের তীব্র রোদ, ধূলিঝড় এবং মরুভূমির আবহাওয়া থেকে মাথা রক্ষা করার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই আরবরা মাথায় টুপি বা পাগড়ি পরিধান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিগণ নিয়মিত মাথায় টুপি পরতেন এবং তার ওপর পাগড়ি বাঁধতেন। নামাজের সময় এবং বিশেষ মজলিসে মাথা ঢেকে রাখা সাহাবিদের সাধারণ অভ্যাস ছিল। রাসূল (সা.) কখনো শ্বেত শুভ্র টুপি, আবার কখনো কালো বা অন্য রঙের পাগড়ি ব্যবহার করেছেন। এটি মুসলিম যুবকদের জন্য একটি সুন্দর সুন্নাত ও আভিজাত্যের প্রতীক।
👳🕊️
✦ ✦
‘খিলাফত’ শব্দের অর্থ প্রতিনিধিত্ব বা স্থলাভিষেক। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একাধারে আল্লাহর নবী এবং মদিনা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর ওফাতের পর নবুয়তের সিলসিলা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলেও, ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দ্বীনকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একজন নেতার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বকেই বলা হয় খিলাফত।
রাসূল (সা.)-এর পর মদিনাবাসীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে হযরত আবু বকর (রা.) প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। তাঁর পর ক্রমান্বয়ে হযরত ওমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। এই চার খলিফার ৩০ বছরের শাসনকালকে ‘খিলাফতে রাশেদা’ বা সঠিক পথপ্রাপ্ত খিলাফত বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে খিলাফত উম্মাহর ঐক্য রক্ষা এবং শরিয়তের আইন বাস্তবায়নের জন্য অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল।
👑📜
☄ ☄
কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করলে তার মাগফিরাতের জন্য জীবিত মুসলমানদের ওপর যে নামাজ আদায় করা ‘ফরজে কিফায়া’, তাকে জানাজার নামাজ বলে। ইসলামের প্রথম যুগে সাহাবিদের মৃত্যুর পর সাধারণ দোয়ার নিয়ম থাকলেও, মদিনায় হিজরতের পর জানাজার এই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও ৪ তাকবীরের নিয়ম শরিয়তে স্থায়ী করা হয়।
পুরুষদের খত্না বা মুসলমানি করার এই নিয়মটি অত্যন্ত প্রাচীন। এটি ‘মিল্লাতে ইব্রাহিমী’ বা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অন্যতম প্রধান সুন্নাত। ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে বৃদ্ধ বয়সে নিজের খত্না করেছিলেন। ইসলাম একে ‘ফিতরাত’ বা মানুষের সহজাত পবিত্রতার অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে এটি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
ইসলামের আগে আরবে কোনো নিয়মনীতি ছাড়া নারীদের ওপর চরম নির্যাতন করে বিয়ে প্রথা চালু ছিল। ইসলাম এসে বহুবিবাহের সীমানা নির্ধারণ করে এবং নারীর সম্মতি, মোহরানা প্রদান এবং অন্তত দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে সামাজিক ঘোষণার (খুতবা) মাধ্যমে বিয়েকে একটি পবিত্র ও আইনগত রূপ দান করে, যা শরিয়া সম্মত বিয়ে নামে পরিচিত।
🤍🕊️
۞ ۞
‘সালাম’ (سلام) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো শান্তি, নিরাপত্তা, ত্রুটিমুক্ত থাকা, আরোগ্য লাভ করা এবং কল্যাণ কামনা করা। মহান আল্লাহ তাআলার পবিত্র গুণবাচক নামসমূহের মধ্যে একটি অন্যতম নাম হলো ‘আস-সালাম’ (السلام), যার অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদানকারী।
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, দুজন মুসলমানের পারস্পরিক সাক্ষাৎ বা যোগাযোগের সময় একে অপরের নিরাপত্তা, দুনিয়াবী ও পরকালীন শান্তি এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করে যে সুনির্দিষ্ট দোয়া বা অভিবাদন বিনিময় করে, তাকে সালাম বলা হয়। এর পূর্ণাঙ্গ রূপ হলো—আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু (السلام عليكم ورحمة الله وبركاته)।
সালামের প্রচলন কোনো মানব রচিত সংস্কৃতি নয়, বরং এটি সরাসরি রব্বুল আলামীনের শেখানো একটি আসমানী সম্ভাষণ। হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পরপরই আল্লাহ তাআলা এই সুন্নাত চালু করেন।
হাদীস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা যখন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন, তখন তাকে বললেন, "যাও এবং ওই ফেরেশতাদের দলকে সালাম দাও। তারা তোমার সালামের জবাবে কী বলে তা মনোযোগ দিয়ে শোনো। কারণ সেটাই হবে তোমার এবং তোমার অনাগত সন্তানদের পারস্পরিক সম্ভাষণ।" আদম (আ.) গিয়ে বললেন, "আস-সালামু আলাইকুম।" ফেরেশতারা জবাবে বললেন, "আস-সালামু আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ।" (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।
পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সালামের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
- সূরা আন-নিসা, আয়াত ৮৬: "যখন তোমাদেরকে কোনো শব্দে সালাম দেওয়া হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম শব্দে সালাম দাও অথবা অন্তত ততটুকুই ফিরিয়ে দাও।"
- সূরা আন-নূর, আয়াত ২৭: "হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্য কারও গৃহে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নাও এবং গৃহবাসীদের সালাম করো।"
- সূরা আল-আনআম, আয়াত ৫৪: "যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে, তারা যখন তোমার কাছে আসে, তখন তুমি বলো—তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক (সালামুন আলাইকুম)।"
রাসূলুল্লাহ (সা.) সালামের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে একে ঈমানের পূর্ণতার শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
- হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমরা ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা পূর্ণ মুমিন হতে পারবে। আর তোমরা ততক্ষণ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে? তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের ব্যাপক প্রচলন করো।" (সহীহ মুসলিম)।
- অন্য হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "ইসলামের কোন আমলটি সবচেয়ে উত্তম?" তিনি বললেন, "অসহায়কে আহার করানো এবং চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেওয়া।" (সহীহ বুখারী)।
সালাম কেবল একটি বাচনিক শব্দ নয়, এটি মানুষের অহংকার ও হিংসা দূর করার এক মহৌষধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আগে সালাম দেয়, সে অহংকার থেকে মুক্ত।" (বায়হাকী)। যখন একজন মানুষ অন্যকে সালাম দেয়, তখন সে মূলত ঘোষণা করে—'আমার পক্ষ থেকে আপনার জান, মাল ও সম্মানের কোনো ক্ষতি হবে না।' এটি সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা তৈরি করে।
ইসলামে সালাম আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু সুন্দর সামাজিক ক্রমানুযায়ী নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত:
- আরোহী ব্যক্তি হেঁটে চলা ব্যক্তিকে সালাম দেবে।
- চলন্ত বা হেঁটে চলা ব্যক্তি উপবিষ্ট বা বসে থাকা ব্যক্তিকে সালাম দেবে।
- ছোটরা বা বয়সে কনিষ্ঠরা বড়দের সালাম দেবে।
- অল্প সংখ্যক বা ছোট দল বৃহৎ দলকে সালাম দেবে।
শরিয়তের হুকুম: আগে সালাম দেওয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ, কিন্তু সালামের উত্তর দেওয়া ‘ওয়াজিব’ (অবশ্য পালনীয়)। কেউ সালাম দিলে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তর না দেয়, তবে সে গুনাহগার হবে।
বর্তমান সমাজে সালামের উচ্চারণে মারাত্মক অবহেলা দেখা যায়। ‘স্লামালাইকুম’, ‘সালামালেকুম’, ‘হিসলামালিকুম’ ইত্যাদি বিকৃত শব্দ উচ্চারণ করা হয়। আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী এই বিকৃত উচ্চারণের অর্থ অত্যন্ত আপত্তিকর ও অভিশাপমূলক রূপ নিতে পারে। যেমন: ‘সাম’ শব্দের অর্থ মৃত্যু বা ধ্বংস। তাই ভুল উচ্চারণে সালাম দিলে অর্থ হতে পারে ‘আপনার মৃত্যু হোক’। সুতরাং, অত্যন্ত স্পষ্ট ও শুদ্ধভাবে "আস-সালামু আলাইকুম" বলতে হবে।
সালামের এই আমলটি শুধু দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি জান্নাতেরও অফিশিয়াল ভাষা। সূরা ইউনুসের ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, "জান্নাতে তাদের পারস্পরিক সম্ভাষণ হবে সালাম।" জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন চারপাশ থেকে ফেরেশতারা তাদের স্বাগত জানিয়ে বলবে, "সালামুন আলাইকুম বিমা সাবারতুম" (তোমাদের ধৈর্যের কারণে তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক)।
✦ ✦
‘আজান’ (أذান) শব্দের অর্থ ঘোষণা, আহ্বান বা বিজ্ঞপ্তি। শরিয়তের পরিভাষায়, নামাজের নির্ধারিত সময় হওয়ার পর সুনির্দিষ্ট কিছু তাওহীদি বাক্যের মাধ্যমে মানুষকে জামায়াতের সাথে নামাজ আদায়ের জন্য আহ্বান করাকে আজান বলা হয়। আজান হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় এবং প্রকাশ্য প্রতীক। এটি মুসলিম জনপদের স্বাধীনতার প্রতীক।
নবী করীম (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন এবং মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন প্রথম দিকে নামাজের কোনো নির্দিষ্ট সংকেত ছিল না। মুসলমানরা আনুমানিক সময় হিসাব করে মসজিদে আসতেন। মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সবাইকে একই সময়ে একত্রিত করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। হিজরীর প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নিয়ে একটি জরুরি পরামর্শ সভা ডাকলেন।
সভায় কেউ খ্রিষ্টানদের মতো শিঙ্গা বাজানোর, কেউ ইহুদিদের মতো ঘণ্টা বাজানোর, আবার কেউ অগ্নিপূজকদের মতো আগুন জ্বালানোর প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু অন্য ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে সাদৃশ্য থাকায় রাসূলুল্লাহ (সা.) সব প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন এবং ব্যথিত চিত্তে সভা মুলতবি করলেন।
পরামর্শ সভা থেকে গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে সাহাবিরা বাড়ি ফিরলেন। সেই রাতেই আনসার সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) একটি অলৌকিক স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখেন, সবুজ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি হাতে একটি ঘণ্টা নিয়ে যাচ্ছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ তাকে বললেন, "ঘণ্টাটি কি বিক্রি করবেন? আমরা নামাজের জন্য মানুষকে ডাকবো।" ওই ব্যক্তি বললেন, "আমি কি এর চেয়ে উত্তম জিনিস শিখিয়ে দেব না?" এরপর তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদকে আজানের শব্দগুলো শিখিয়ে দিলেন এবং একটু বিরতি দিয়ে একামত বা ইকামতের শব্দগুলোও শেখালেন।
সকালে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে স্বপ্নের কথা বিস্তারিত বললেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, "নিশ্চয়ই এটি সত্য স্বপ্ন।" এরপর তিনি আব্দুল্লাহকে বললেন, "তুমি বেলালের কাছে যাও এবং তাকে শব্দগুলো শিখিয়ে দাও। কারণ বেলালের কণ্ঠস্বর তোমার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চ ও সুমধুর।"
হযরত বেলাল (রা.) যখন মদিনার উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে প্রথম আজান দিলেন, তখন সেই শব্দ শুনে হযরত ওমর (রা.) ঘর থেকে চাদর টানতে টানতে ছুটে এলেন এবং বললেন, "আল্লাহর কসম! আমিও রাতে হুবহু এই স্বপ্নই দেখেছি।" মদিনার আরও বেশ কয়েকজন সাহাবি একই স্বপ্নের কথা নিশ্চিত করেন। এভাবেই আজানের আসমানী ফয়সালা সম্পন্ন হয়।
আজানের বাক্যগুলোর মধ্যে ইসলামের মূল ভিত্তি তথা আল্লাহর একত্ববাদ এবং রাসূল (সা.)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য জড়িয়ে আছে।
| আজানের আরবী বাক্য | বাংলা উচ্চারণ | অর্থ | আবৃত্তি সংখ্যা |
|---|---|---|---|
| الله أكبر | আল্লাহু আকবার | আল্লাহ সবচেয়ে মহান | ৪ বার |
| أشهد أن لا إله إلا الله | আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ | আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই | ২ বার |
| أشهد أن محمداً رسول الله | আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ | আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল | ২ বার |
| حي على الصلاة | হাইয়া আলাস্ সালাহ্ | নামাজের দিকে এসো | ২ বার |
| حي على الفلاح | হাইয়া আলাল ফালার্ | কল্যাণের দিকে এসো | ২ বার |
| الله أكبر | আল্লাহু আকবার | আল্লাহ সবচেয়ে মহান | ২ বার |
| لا إله إلا الله | লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ | আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই | ১ বার |
ফজরের আজানে একটি বিশেষ বাক্য যুক্ত করা হয়: "আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম" (الصلاة خير من النوم), যার অর্থ—‘ঘুম হতে নামাজ উত্তম’।
এর ইতিহাস হলো, একদিন ফজরের সময় হযরত বেলাল (রা.) আজান দিতে গিয়ে দেখলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) তখনও ঘুমাচ্ছেন। তখন তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চকণ্ঠে এই বাক্যটি বলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) জাগ্রত হয়ে বেলালের এই বাক্যটি অত্যন্ত পছন্দ করেন এবং একে ফজরের আজানের স্থায়ী অংশ করার নির্দেশ দেন।
আজান দেওয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ, যা ইসলামের শিআর বা প্রতীক হওয়ার কারণে কোনো মুসলিম জনপদে আজান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
হাদীসে মুয়াজ্জিনের অনন্য মর্যাদার কথা এসেছে:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কেয়ামতের দিন মুয়াজ্জিনদের ঘাড় বা মস্তক সমস্ত মানুষের চেয়ে উঁচু থাকবে।" (সহীহ মুসলিম)।
- মুয়াজ্জিনের আজানের আওয়াজ যতদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, তার সাউন্ডের সীমানার মধ্যে থাকা সমস্ত জিন, ইনসান, তরুলতা ও পাথর কেয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে তার ঈমানের সাক্ষ্য দেবে।
আজান কেবল নামাজের সময় ঘোষণা করে না, এটি শয়তানকে বিতাড়িত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। হাদীসে এসেছে, আজানের শব্দ শুনলে শয়তান বায়ু ত্যাগ করতে করতে বহুদূরে পালিয়ে যায়। সামাজিক দিক থেকে আজান মানুষকে জাতি, বর্ণ ও ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে দিনে পাঁচবার এক কাতারে শামিল হওয়ার প্রেরণা জোগায়। এটি মুসলমানদের দৈনিক শৃঙ্খলার মূল চাবিকাঠি।
সালাম এবং আজান—ইসলামের এই দুটি অনন্য রীতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি আদর্শ, শান্তিময় ও সুশৃঙ্খল সমাজের রূপরেখা। সালামের মাধ্যমে তৈরি হয় পারস্পরিক ভালোবাসা ও নিরাপত্তা, আর আজানের মাধ্যমে তৈরি হয় আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও পরম ঐক্য। আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এই দুটি আমলকে শুদ্ধভাবে এবং সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠা করাই হোক এই বইটির মূল শিক্ষা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন।
❀ ❀
প্রিয় তরুণ বন্ধুরা, ইসলামের প্রতিটি নিয়ম, উৎসব এবং ইবাদত কেবল অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। এই ইতিহাস জানা থাকলে দ্বীনের ওপর চলা আমাদের জন্য অনেক সহজ ও আনন্দের হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামের সঠিক ইতিহাস জেনে সেই অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
🤲🌙✨
মোহাম্মদ শওকত আকবার দ্বারা এই বইটি রচনা, ডিজাইন ও কোডিং সম্পন্ন হয়েছে
এখনো কোনো রিভিউ নেই — প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!
