সুস্থ শরীর, সুন্দর মন — নিজেকে জানো, নিজেকে ভালোবাসো
কৈশোর শুরু হয় প্রায় ১০ বছর বয়স থেকে এবং চলে ১৯ বছর পর্যন্ত। একে বয়ঃসন্ধিও বলা হয়। এই সময় শরীর খুব দ্রুত বাড়ে ও বদলায়, আর এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
- উচ্চতা ও ওজন দ্রুত বাড়ে
- ছেলেদের গলার স্বর ভারী হয়, মুখে গোঁফ-দাড়ি আসতে শুরু করে
- মেয়েদের শারীরিক গড়নে পরিবর্তন আসে এবং মাসিক শুরু হয়
- ত্বকে ব্রণ ও ঘাম বাড়ে
💡 পরিবর্তন সবার একই বয়সে শুরু হয় না — কারও আগে, কারও পরে।
শরীরের সাথে সাথে মনেও ঝড় ওঠে। কখনো খুব আনন্দ, কখনো অকারণে রাগ বা কান্না আসতে পারে। এর একটি কারণ শরীরের হরমোনের পরিবর্তন।
- নিজের স্বাধীনতা ও আলাদা পরিচয় চাইতে ইচ্ছা করে
- বন্ধুদের মতামত খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়
- কারও প্রতি ভালো লাগা তৈরি হতে পারে — এটাও স্বাভাবিক অনুভূতি
💡 রাগ উঠলে ১০ পর্যন্ত গুনে গভীর শ্বাস নাও, তারপর কথা বলো।
প্রত্যেক মানুষ আলাদা এবং বিশেষ। চেহারা, গায়ের রঙ বা উচ্চতা দিয়ে নিজের মূল্য মাপা ঠিক নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টার করা ছবি বাস্তব নয়।
- নিজের ভালো গুণগুলো লিখে রাখো
- অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা কোরো না
- কেউ চেহারা নিয়ে খারাপ কথা বললে সেটা তার দোষ, তোমার নয়
- প্রশ্ন মনে এলে বিশ্বস্ত বড়দের জিজ্ঞেস করো
কিশোর বয়সে শরীর দ্রুত বাড়ে, তাই বেশি পুষ্টি দরকার। প্রতি বেলার খাবারে ভাত বা রুটির সাথে মাছ, মাংস, ডিম বা ডাল এবং শাকসবজি ও ফল রাখো।
- আয়রনের জন্য কচুশাক, পুঁইশাক, কলিজা, ডাল ও ডিম
- ক্যালসিয়ামের জন্য দুধ, দই ও ছোট মাছ
- ভিটামিন সি-এর জন্য পেয়ারা, লেবু, আমলকী ও মৌসুমি ফল
💡 রঙিন খাবারে বেশি ভিটামিন থাকে — পাতে যত রং, তত পুষ্টি।
সকালের নাস্তা সারাদিনের শক্তির ভিত্তি। নাস্তা না করলে ক্লাসে মনোযোগ কমে ও দুপুরে বেশি ক্ষুধা পায়।
- রুটি-ডিম, খিচুড়ি বা মুড়ি-বাদাম-কলা ভালো নাস্তা
- দিনে অন্তত ৮ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করো
- খাওয়ার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোও
- টিফিনে ঘরের বানানো খাবার নেওয়ার চেষ্টা করো
চিপস, ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক ও অতিরিক্ত মিষ্টি বেশি খেলে মোটা হওয়া, দাঁতের ক্ষয় ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
- কোমল পানীয়ের বদলে পানি, লেবুর শরবত বা ডাবের পানি
- রাস্তার খোলা ও বাসি খাবার এড়িয়ে চলো
- ভাজাপোড়া মাঝে মাঝে খাও, প্রতিদিন নয়
💡 এনার্জি ড্রিংক কিশোরদের জন্য উপযুক্ত নয়।
ওজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় না খেয়ে থাকা বা জোর করে ডায়েট করা খুব ক্ষতিকর। এতে বাড়ন্ত শরীরের পুষ্টি কমে যায় ও দুর্বলতা আসে।
- ওজন নিয়ে চিন্তা থাকলে ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের সাথে কথা বলো
- ধীরে ধীরে খাও এবং পেট ভরলে থামো
- খেলাধুলা ও সুষম খাবারই সুস্থ ওজনের চাবিকাঠি
💡 নিজের শরীর নিয়ে সবসময় খারাপ লাগলে বড়দের জানাও।
কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার। ঘুমের সময় শরীর বাড়ে, আর মস্তিষ্ক সারাদিনের পড়া গুছিয়ে মনে রাখে।
- ঘুম হলো শরীরের রিচার্জ
- বাড়ন্ত হাড় ও পেশি ঘুমের সময় বেশি গড়ে ওঠে
- ভালো ঘুম মেজাজ ভালো রাখে
💡 ঘুম সময় নষ্ট নয়, এটি সুস্থতার বিনিয়োগ।
ভালো ঘুমের জন্য নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
- প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাও ও উঠো
- ঘুমের অন্তত ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল, টিভি ও গেম বন্ধ করো
- বিকেলের পর চা, কফি ও এনার্জি ড্রিংক এড়াও
- ঘর অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক রাখো
ঘুম কম হলে মনোযোগ কমে, মন খিটখিটে হয়, পড়া মনে থাকে না এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
- পরীক্ষার আগে সারারাত জাগা ঠিক নয়
- দুপুরে ২০–৩০ মিনিটের ছোট বিশ্রাম উপকারী
- দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নাও
প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম হাড় ও পেশি শক্ত করে, হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখে এবং মন প্রফুল্ল রাখে।
- দৌড়, সাইকেল, সাঁতার, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন
- ঘরের ভেতরে স্কিপিং, যোগব্যায়াম বা নাচ
- বন্ধুদের সাথে খেললে মজাও বেশি
💡 খেলাধুলা শেখায় দলগত কাজ আর হার মেনে নেওয়ার সাহস।
ব্যায়াম উপকারী হলেও সঠিক নিয়মে করতে হয়, নইলে চোট লাগতে পারে।
- শুরুতে ৫ মিনিট হালকা ওয়ার্মআপ করো
- খেলার সময় প্রচুর পানি পান করো
- খুব রোদের সময় বাইরে খেলা এড়িয়ে চলো
- ব্যথা পেলে জোর করে খেলো না, বিশ্রাম নাও
পড়ার টেবিলে বা মোবাইলে ঝুঁকে থাকলে ঘাড়, পিঠ ও কোমরে ব্যথা হয়। সঠিক ভঙ্গি বাড়ন্ত শরীরের জন্য খুব জরুরি।
- প্রতি ৪৫ মিনিট পরপর উঠে একটু হাঁটো
- সোজা হয়ে বসো, পা মাটিতে রাখো
- স্কুলব্যাগ দুই কাঁধে নাও এবং বেশি ভারী করো না
বয়ঃসন্ধিতে ঘাম ও তৈলাক্ততা বাড়ে, তাই পরিচ্ছন্নতা আরও জরুরি। পরিচ্ছন্ন থাকলে রোগ কম হয় এবং আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।
- প্রতিদিন গোসল করো ও পরিষ্কার জামা পরো
- দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করো
- নখ ছোট রাখো, চুল পরিষ্কার রাখো
- টয়লেট শেষে ও খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোও
ব্রণ প্রায় সব কিশোর-কিশোরীরই হয়। এটি হরমোনের কারণে হয়, লজ্জার কিছু নয়।
- দিনে দুইবার মুখ ধোও
- ব্রণ খোঁটা বা চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকো
- তেলতেলে মুখে বারবার হাত দিও না
- ব্রণ বেশি হলে নিজে ক্রিম না লাগিয়ে চর্মরোগ চিকিৎসকের কাছে যাও
মেয়েদের মাসিক একটি স্বাভাবিক ও সুস্থতার লক্ষণ। এতে লজ্জা বা ভয়ের কিছু নেই। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এটি শুরু হয়।
- পরিষ্কার প্যাড ব্যবহার করো এবং ৪–৬ ঘণ্টা পরপর বদলাও
- ব্যবহৃত প্যাড কাগজে মুড়ে ডাস্টবিনে ফেলো, টয়লেটে নয়
- এই সময়ে পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি খাও
- ব্যথা খুব বেশি হলে বা অনেক অনিয়ম হলে মা বা ডাক্তারকে জানাও
💡 মাসিকের সময়ও স্কুল, খেলাধুলা ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া যায়।
ছেলেদের শরীরেও বয়ঃসন্ধির পরিবর্তন আসে। ঘুমের মধ্যে বীর্যপাত হওয়া (স্বপ্নদোষ) স্বাভাবিক, এতে অসুস্থতার কিছু নেই।
- গোপনাঙ্গ প্রতিদিন পরিষ্কার রাখো ও পরিষ্কার অন্তর্বাস পরো
- ভুল ধারণা না রেখে বাবা, বড় ভাই বা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করো
- মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে ঠাট্টা না করে সম্মান করতে শেখো
পরীক্ষার চাপ, বন্ধুত্ব, চেহারা নিয়ে দুশ্চিন্তা — কিশোর বয়সে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। শরীরের মতো মনেরও যত্ন দরকার।
- মন খারাপ হলে বিশ্বস্ত কারও সাথে কথা বলো
- গভীর শ্বাস নাও, ডায়েরি লেখো, প্রকৃতির মাঝে হাঁটো
- পছন্দের কাজ, যেমন আঁকা, গান বা বই পড়ায় সময় দাও
💡 অনুভূতি লুকিয়ে না রেখে প্রকাশ করলে মন হালকা হয়।
পড়াশোনার চাপ সামলাতে নিয়ম মেনে চলা দরকার। আর কেউ তোমাকে ডাকনামে অপমান করলে, ভয় দেখালে বা মারধর করলে সেটা বুলিং, যা মেনে নেওয়ার বিষয় নয়।
- পড়ার রুটিন বানাও, মাঝে মাঝে বিরতি নাও
- ফলাফল জীবনের শেষ নয়; ভুল থেকেও শেখা যায়
- বুলিং হলে শিক্ষক বা অভিভাবককে জানাও
- নিজে অন্য কাউকে বুলিং করো না
অনেক দিন ধরে কিছুই ভালো না লাগলে, ঘুম-খাওয়া নষ্ট হলে, কারও সাথে মিশতে ইচ্ছা না করলে বা নিজের ক্ষতির চিন্তা এলে দেরি না করে সাহায্য নাও।
- সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, সাহসের কাজ
- বাবা-মা, শিক্ষক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে জানাও
- বন্ধুর এমন অবস্থা দেখলে তার পাশে থাকো ও বড়দের জানাও
💡 জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে অথবা স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরে যোগাযোগ করো।
মোবাইল, গেম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটালে চোখ, ঘুম, পড়াশোনা ও মন সবকিছুর ক্ষতি হয়।
- বিনোদনের জন্য স্ক্রিন টাইম দিনে ২ ঘণ্টার কম রাখো
- ২০ মিনিট পরপর ২০ সেকেন্ড দূরের কিছুর দিকে তাকাও
- খাওয়ার সময় ও ঘুমের আগে মোবাইল দূরে রাখো
💡 মাঝে মাঝে স্ক্রিন-ফ্রি সময় রাখো — পরিবারের সাথে গল্প করো।
ইন্টারনেটে সবাই যেমন দেখায় তেমন নয়। অচেনা কারও সাথে সম্পর্ক গড়লে বিপদ হতে পারে।
- অচেনা কারও সাথে ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা বা ছবি শেয়ার করো না
- পাসওয়ার্ড কাউকে দিও না
- অনলাইনে কেউ অস্বস্তিকর কিছু বললে বা ছবি চাইলে 'না' বলো, ব্লক করো ও বড়দের জানাও
- সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করো না
তোমার শরীর শুধু তোমার। কেউ তোমাকে অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করলে বা এমন কিছু করতে বললে, সে যে-ই হোক, তুমি 'না' বলতে পারো।
- অস্বস্তি লাগলে সেখান থেকে সরে এসো
- বিশ্বস্ত বড়দের (মা, বাবা, শিক্ষক) জানাও — এটা তোমার দোষ নয়
- কেউ 'কাউকে বলো না' বললে সেটা সতর্কসংকেত
💡 সাহায্যের জন্য ১০৯ (নারী ও শিশু) বা ১০৯৮ (শিশু হেল্পলাইন) নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
ধূমপান, ভেপ, তামাক, জর্দা ও মাদক ক্ষণিকের মজা মনে হলেও শরীর ও জীবনের বড় ক্ষতি করে। কিশোর বয়সের মস্তিষ্ক সহজেই আসক্ত হয়ে পড়ে।
- ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র ও দাঁতের ক্ষতি হয়
- পড়াশোনা ও স্মরণশক্তি নষ্ট হয়
- টাকা-পয়সা ও পরিবারের সম্মানের ক্ষতি হয়
💡 ভেপ নিরাপদ নয় — এতেও আসক্তিকর নিকোটিন থাকে।
বন্ধুর চাপে বা কৌতূহলে অনেকে প্রথমবার নেশা করে। 'না' বলতে শেখাই সবচেয়ে বড় সাহস।
- স্পষ্ট ভাষায় বলো, 'না, আমি করি না'
- চাপ দিলে সেখান থেকে সরে এসো
- ভালো বন্ধু বেছে নাও — যারা তোমার ভালো চায়
- আগে থেকে অজুহাত ঠিক রাখো, যেমন 'আমার খেলার অনুশীলন আছে'
কেউ যদি ইতিমধ্যে নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তাকে দোষারোপ নয়, চিকিৎসার সাহায্য দরকার। নেশা একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।
- লুকিয়ে না রেখে বিশ্বস্ত বড়দের বলো
- ডাক্তার বা নেশা নিরাময় কেন্দ্রে যোগাযোগ করো
- বন্ধুকে সাহায্য করতে চাইলে বড়দের সাথে নিয়ে এগোও
💡 ফিরে আসার পথ সবসময় খোলা থাকে।
সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ উপায় রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা। টিকা অনেক বিপজ্জনক রোগ থেকে বাঁচায়।
- প্রয়োজনীয় টিকা সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নাও
- বছরে একবার চোখ ও দাঁত পরীক্ষা করাও
- নিজে নিজে ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খেও না
💡 ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নাও।
বর্ষায় ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও সর্দি-জ্বর বেশি হয়। একটু সচেতন থাকলেই এগুলো এড়ানো যায়।
- ডেঙ্গু: জমা পরিষ্কার পানি ফেলে দাও, কারণ এডিস মশা সেখানে ডিম পাড়ে ও দিনের বেলা কামড়ায়
- ডায়রিয়া হলে খাওয়ার স্যালাইন পান করো এবং ডাক্তার দেখাও
- জ্বর বা শরীরব্যথা কয়েক দিনের বেশি থাকলে হাসপাতালে যাও
- কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখো
ছোটখাটো দুর্ঘটনায় কী করতে হয় জানা থাকলে বিপদ কমে।
- আগুনে পুড়লে পোড়া স্থান ১০–২০ মিনিট চলমান ঠান্ডা পানিতে রাখো, টুথপেস্ট বা তেল লাগিও না
- কেটে গেলে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে চেপে রক্ত বন্ধ করো ও ক্ষত ধুয়ে নাও
- রাস্তা পার হতে জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করো
- সাইকেল বা মোটরসাইকেলে হেলমেট পরো
💡 গুরুতর হলে দেরি না করে ৯৯৯ নম্বরে কল করো বা হাসপাতালে যাও।
এই বই শুধু সাধারণ সচেতনতার জন্য; এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।
এখনো কোনো রিভিউ নেই — প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!
